ঘটনাটা আমার ছোটো পিসির মেয়ের কাছে শোনা। আমার পিসির বাড়ি যদিও বাংলাদেশের খুলনা জেলায় তবে দিদি এখন বিয়ে করে ইন্ডিয়াতে সেটেল্ড। বিয়ের আগে মাঝে মধ্যেই কোলকাতায় আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতো, তখনই ঘটনাটা শুনেছি। যাক, মূল ঘটনায় আসা যাক।
ঘটনাটা ঘটে ২০০৬ সালে, আমার দিদি (পিসির মেয়ে) তখন খুলনার একটা ডিপ্লোমা কলেজে ফাইনাল ইয়ার-এ পড়ছে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব খানিকটা বেশী হওয়ায় কলেজের কাছেই একটা গার্লস্ হস্টেলে থাকা শুরু করে। এখানে হস্টেলের একটু বর্ণনা দিয়ে রাখা দরকার। হস্টেলটা ছিল বেশ বড়োসড়ো একটা দোতলা বাড়ি, যার উপর তলায় ছিল কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের জন্য বড়ো বড়ো চারটে বেডরুম, একটা কমন বাথরুম আর কমন প্যাসেজ। নিচতলায় ছিল কমন ডাইনিং আর কমন হল। বাড়ির মালিক শেখ নবাব উদ্দিন তার পরিবার নিয়ে নিচ তলাতেই থাকতেন, পরিবার বলতে তিনি আর তার দুই মেয়ে। ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের ব্যাবস্থাটা বাড়িওয়ালাই করে দিতেন তবে ডিনারটা নিজেদেরই পাল্টাপাল্টি করে রান্না করতে হতো।
হস্টেলে যাওয়ার আগে অনেকেই দিদিকে বলেছিল ওখানে না যেতে, শোনা যায় বাড়িটা নাকি ভালো না। এর আগেও নাকি অনেকেই ওই হস্টেলে থেকেছে এবং তাদের নিয়ে অনেক অলৌকিক দূর্ঘটনার কথাও শোনা গেছে। দিদিরও প্রথম প্রথম হস্টেল-এ এসে একটু খটকা লেগেছিল,- "বাড়িটা আসলেই কেমন যেন"।
কলেজ ক্যাম্পাসের কাছাকাছি হলেও বড়োরাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, বাড়ির আশপাশে অনেকটা জায়গা জূড়ে জঙ্গল আর বাশবাগান। এক সময় নাকি এখানেই কবরস্থান ছিল, ১৯৯০ সালের দিকে অনেকদিন অব্যবহৃত থাকায় ও বেওয়ারিশ জমির কোনো মালিক খুজে না পাওয়ায় জমিটা নিলাম হয়ে যায়, নবাব উদ্দিন নিলামে জমিটা কিনে নেন আর সেখানে একটা দোতলা বাড়ি করে স্ত্রী ও দুই মেয়ের সাথে বসবাস শুরু করেন। তবে, কিছু মাসের মধ্যেই নবাব উদ্দিন- এর স্ত্রী অস্বাভাবিক ভাবে মারা যায়, তার মৃতদেহ বাড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে, সবচেয়ে আশ্চর্যকর বিশয়টা হল, ঝুলন্ত মৃতদেহের শরীরে কিংবা আশেপাশে কোথাও তার ডান দিকের একটা পা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সমস্ত বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই পা আর পাওয়া গেল না।
সেই দিনের পরে ১৬ টা বছর কেটে গেছে, আজও কেউ ওই পা-য়ের রহস্য উদ্ধার করতে পারেনি।এত বছর পরে আবার একদিন এই হস্টেলে আরও একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার, রাতের ডিনার রান্নার দ্বায়িত্ব দিদির। রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ রান্না শেষ করে দিদি সবাই-কে ডিনার করার জন্য ডাইনিং রুম-এ আসতে বলে। এক এক করে সবাই ডাইনিং টেবিলে এসে যে যার চেয়ারে বসে পরে। দিদি খেয়াল করলো একটা চেয়ার ফাঁকা, আলিশা আসেনি। আলিশাও দিদিদের সাথে এই হস্টেলে থাকতো, সেকেন্ড ইয়ার-এর ছাত্রী। সেদিন তার শরীর-টা খারাপ থাকায় রাত ৮ টা নাগাদ বিছানায় শুয়ে পরে, সবাই বার বার অনুরোধ করেও তাকে ডিনার করার জন্য রাজী করাতে পারলনা, তাই তাকে ঘুমোতে দিয়ে, সবাই নীচে এসে ডিনার করতে শুরু করল। মিনিট ১০ পরে, হঠাৎ একটা প্রচন্ড চিৎকারে সবার খাওয়া থেমে যায়, আলিশা !! এক অশুভ আশঙ্কার আভাসে উত্তেজিত হয়ে সবাই তরিঘরি দোতলায় আলিশার ঘরের দিকে ছোটে। ঘর অন্ধকার, খোলা জানালার আবছা আলোয় দেখা গেল বিছানায় আলিশা নেই, লাইট জালাতেই সবাই যা দেখল তাতে ভয়ে-আশঙ্কায়, শিহরণে সবার গায়ের রোম দাঁড়িয়ে গেল। মেঝেতে চিৎ হয়ে পরে আছে আলিশা, অজ্ঞান, অচেতন, দুই চোখ বিষ্ফারিত হয়ে এক ভাবে চেয়ে রয়েছে সিলিং-এর দিকে, দুই ঠোঁট হা-করে ফাঁক করা, যেন এখনও নিঃশব্দে প্রাণ কাঁপানো মর্মান্তিক চিৎকার করে চলেছে, শোনা যাচ্ছে না তবে তা বেশ অনুভব করা যায়।
সবাই মিলে ধরাধরি করে তাকে বিছানায় এনে শুইয়ে দিল। এরি মধ্যে চিৎকার ও হৈচৈ শুনে বাড়িওয়ালাও এসে হাজির। বাড়িওয়ালা একটা ডাক্তার কে কল করে তৎক্ষনাৎ আসতে বলল। তবে, ডাক্তারের আর দরকার হয়নি, চোখে মুখে জল দিতেই মিনিট ৫-এর মধ্যে তার জ্ঞান ফিরে এল। জ্ঞান ফিরে একটু স্বাভাবিক হতেই আলিশা কান্না শুরু করে দিল। হস্টেলের সবাই তখন মরিয়া হয়ে এই ঘটনার কারণ জানতে চাইছে, সবার সব প্রশ্ন উপেক্ষা করে আলিশার প্রান হিম করা কান্না চলতে লাগলো। টানা ২ মিনিট কান্নাকাটির পরে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে সে বলতে শুরু করে। সবাই মন ভরা কৌতুহল নিয়ে আলিশার প্রত্যেকটা কথা নিখুত ভাবে শুনতে লাগল।
আধ ঘন্টা আগে সবাই যখন ডিনার করার জন্য নীচে চলে গেল, তার কিছুক্ষণ পরে আলিশা গেছিল বাথরুমে। বাথরুমের দরজা খুলতে গিয়ে আলিশা টের পেল দরজা ভিতর থেকে লক করা - "কী ব্যাপার !! এই তো সবে মাত্র সবাই নীচে গেল ডিনার করতে, এরই মধ্যে আবার কে এসে বাথরুমে ঢুকলো !" এসব ভাবতে ভাবতে দরজায় নক করল আলিশা। সঙ্গে সঙ্গে দরজার লক ভিতর থেকে খুলে গেল। তারপর মনে হলো কেউ যেন ভিতর থেকে আস্তে আস্তে দরজাটা টেনে খুলছে। দরজা খুলতেই আলিশার হৃদপিন্ড-টা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, সে যা দেখলো সেই দৃশ্য দেখার জন্য সে কল্পনাতেও প্রস্তুত ছিলনা বা আমরা কেউই হয়তো এমন দৃশ্য কখনোই প্রত্যক্ষ করতে চাইবোনা। সে দেখলো বাথরুমের সিলিং-এর একটা হুকের সাথে বাঁধা একটা দড়ি, তাতে একটা ফাঁসের মতো গিট বাঁধা, আর সেই ফাঁসে গলার সাহায্যে আটকে আছে একটা গোটা শরীর। ঝুলন্ত মৃতদেহ ! নিষ্পলক তাকিয়ে আছে আলিশার দিকে, চোখে অজস্র দুঃখের ছাপ, দেহের ডান দিকের একটা পা-য়ের হাটুর নীচের অংশ নেই, দুই হাত আস্তে আস্তে আলিশার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে যেন সাহায্য চাইছে, সেই হাত ধীরে ধীরে আলিশা-র দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগলো আর কাতর স্বরে একটি নারীকন্ঠ বারবার প্রতিফলিত হতে লাগল সমস্ত ঘর জুড়ে - "আমাকে ছেড়ে যেওনা, বাঁচাও ! আমাকে ছেড়ে যেওনা"।
এতক্ষণে আলিশার মোহ কাটল, প্রানপণ চিৎকার করে দৌড়ে চলে গেল ঘরে, এক লাফে বিছানায় উঠে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পরলো। হঠাৎ তার মনে হলো, পা-য়ের কাছে কিছু একটা ঠেকছে, চাদর সরিয়ে দেখতে পেল একটা পা, যার বিস্তার হাটু অবধি, যেন শরীর থেকে টেনে ছিঁড়ে নিয়েছে কেউ। আলিশা আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা, ঝাপিয়ে পরলো মেঝেতে, কিন্তু কেউ একজন তার পা টেনে ধরে তাকে আটকাতে চাইছে, চিৎকার করতে গিয়ে মনে হলো কেউ যেন তার গলা চেপে স্বর রোধ করার চেষ্টা করছে, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আলিশার চোখে সব কিছু অন্ধকারে আবছা হয়ে গেল, জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পরলো আলিশার নিস্তেজ শরীর।
লেখক : অন্তু সরকার
স্থান : বারাসাত, কোলকাতা



দারুন লাগলো গল্পটা🎉
উত্তরমুছুনঅবশেষে পা খুঁজে পাওয়া গেল। মাই গড!
উত্তরমুছুন