সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নন্দনগড় অভিযান (পার্ট - ২)

নন্দনগড় অভিযান (পার্ট - ১) পড়ার জন্য
এই লিংক-এ ক্লিক করুন : নন্দনগড় অভিযান (পার্ট-১)


ষ্টেশন থেকে বেরিয়েই সৌম্যকে দেখতে পেয়ে বেশ খুশি হলাম, দূর থেকে হাত নেড়ে ইশারা করলাম, সৌম্যও আমাকে দেখতে পেয়ে ওর কাছে যেতে ইশারা করলো। কাছে যেতেই সৌম্য বললো, 
- "ভাবলাম নতুন যায়গায় এসে তোর চিনতে অসুবিধা হবে, আর আমাদের ওদিকে গাড়ি ঘোড়াও এই সময়ে বেশি একটা পাওয়া যায়না। তাই বাইক নিয়ে তোকে রিসিভ করতে চলে এলাম।"
- "তা খুব ভালোই করেছিস, তাছাড়া তোর ওই গল্প শোনার পরে একা তোদের গ্রামে যেতে গেলে ভয়ে আমার অর্ধেক আয়ু কমে যেত।" বলে হো হো করে হেসে উঠলাম। সৌম্যও আমার হসিতে সঙ্গ দিলো বটে, কিন্তু তার হাসিতে আনন্দ বা খুশি হওয়ার কোনো ছাপই চোখে পড়লনা। ১ বছর আগে যে সৌম্যকে দেখেছি সব সময় হাসি তামাসার মধ্যে থাকতে, তার সাথে আজকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই সৌম্যর বিস্তর তফাত। চেহারায় সেই উজ্বল সচ্ছলতা কোথায় হারিয়ে গেছে, চোখের তলায় দীর্ঘ অনিদ্রার কালো ছাপ, মুখ শুকিয়ে চামড়ায় ভাজ পরেছে, শরীর আগের থেকে অনেক বেশি রোগা আর দূর্বল। দেখলেই মনে হয়, সবসময় যেন কোনো দূশ্চিন্তা আর আতঙ্ক ঘিরে রেখেছে তাকে।
আমি ওর কাধে হাত রেখে বললাম,- "কিরে! নিজের কি হাল করেছিস দেখেছিস একবার? খাওয়া ঘুম তো মনে হয় ছেড়েই দিয়েছিস একেবারে।"
সৌম্য ভারী গলায় বললো,- "তুই এখনও বুঝতে পারছিস না ভাই, আগে বাড়িতে চল, গেলেই বুঝতে পারবি আমি কি ভাবে দিন কাটাচ্ছি।"
আমি আর কথা না বাড়িয়ে বাইকে উঠে বসলাম। সৌম্য বাইক স্টার্ট করে চালানো শুরু করলো। খানিক দূর যাওয়ার পরে সৌম্য বাইকটা একটা চায়ের দোকানে দাঁড় করিয়ে বললো,- "এখনও আধ্ ঘন্টা লাগবে বাড়ি পৌঁছোতে, তুই তো অনেকটা জার্নি করে আসলি, এখানে একটু চা-টা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নে, তারপর আবার যাওয়া যাবে খন।"
চায়ের প্রস্তাবে আমি কখনও অমত করিনা, রাজি হয়ে গেলাম। বাইক থেকে নেমে মোবাইল বের করে দেখলাম ৮টা বাজে। কাধের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে দোকানের পাশে একটা চাপাকলে হাত মুখ ধুতে চলে গেলাম। চাপাকলের ঠান্ডা জল গায়ে পড়তেই সারাদিনের সব ক্লান্তি উধাও হয়ে গেল। হাত মুখ ধূয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছতে মুছতে দোকানে ফিরে এলাম। এসে দেখি সৌম্য দু'কাপ মালাই চা নিয়ে একটা বেঞ্চের উপর বসে আমায় ডাকছে। বেঞ্চের উপর বসতেই আমার হাতে একটা কাপ ধরিয়ে দিয়ে বললো,- "এমন চা আর কোথাও পাবি না, বর্ধমানের সেরা চা। অনেক দূর দূর থেকে লোকে এখানে চা খেতে আসে। দোকানের মালিক তিন পুরুষ ধরে এইখানেই চা বিক্রি করছে। এক চুমুক খেয়ে দেখ।"
সৌম্যর কথা শুনে চায়ের স্বাদ সম্পর্কে প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে কাপে সশব্দে একটা চুমুক দিলাম। আমেজিং ! সত্যিই এমন চা আমি আগে কখনও খাইনি। নিজে একজন প্রানপণ চা প্রেমী হওয়ায় বহু যায়গার রকমারী চা আমি খেয়েছি, কিন্তু এই চা টা অতুলনিও, খাঁটি মোষের দূধের মালাইতে ভরপুর, সে যেন অমৃত। আমার মতো যারা চায়ের ভক্ত, তারা বেশ বুঝতে পারছে আমার অনুভূতি। পরপর তিন কাপ চা আমি একাই খেয়ে ফেললাম, আর প্রত্যেক চুমুকে চায়ের স্বাদের তারিফ করতে লাগলাম। চা খাওয়া শেষ করে সৌম্য পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল, আমি ওখান থেকে একটা তুলে নিয়ে জ্বাললাম। দুই বন্ধু সিগারেট টানতে টানতে আরও কিছুক্ষণ ওই চা নিয়েই আলোচনা চালালাম। সিগারেট খাওয়া শেষ করে দোকানদারের বিল মিটিয়ে আবার বাইকে উঠে বসে পড়লাম। টানা ২০ মিনিট হাইওয়ের উপর বাইক চলার পরে বাঁ দিকে একটা নীচু রাস্তায় ঢুকে গিয়ে সৌম্য বললো এখান থেকেই ওদের গ্রাম শুরু হচ্ছে। রাস্তার শুরুতেই একটা রঙচটা বোর্ডে গ্রামের নাম লেখা রয়েছে- "নন্দনগড়, বর্ধমান"। গ্রামের রাস্তা হলেও যে যথেষ্ট উন্নত তাতে কোনো সন্দেহ নেই, রাস্তাঘাট পাকা আর লাইট পোষ্টও আছে রাস্তার দুপাশে। এখানে আসার আগে যেমন খোলামেলা সবুজ গ্রাম কল্পনা করেছিলাম, গ্রামটা তেমন নয়। খোলা মাঠ আর ক্ষেত এখানে আছে, তবে তা খুব বেশী না, প্রত্যেকটা বাড়িই পাকা আর তাতে ইলেক্ট্রিক কানেকশনও আছে। রাস্তা দুপাশের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাড়িগুলির ভেতর থেকে টিভিতে বাংলা সিরিয়াল চলার আওয়াজ পেলাম। বললাম,- "সিরিয়ালের নেশা তো দেখছি গ্রামে গঞ্জেও ছড়িয়ে পরেছে রে।" আমার কথা শুনে সৌম্য হাসতে হাসতে বললো,- "তোদের শহরে আর কটা লোক সিরিয়াল দেখে বলতো, আমাদের এখানে থাকলে দেখতে পারবি, স্নান-খাওয়া-দাওয়ার মতো সিরিয়ালটাও রোজকার জীবনের একটা অঙ্গ।" এইসব বলাবলি করে দুজনে হাসতে হাসতে বাড়ি পৌঁছে গেলাম।
সৌম্যদের বাড়িটা বেশ বড়ো, বাড়িতে মোট ১৫ জন সদস্য। এখনও গ্রামের দিকে এমন জয়েন্ট ফ্যামিলি দেখা যায়, শহরে তো এই ব্যবস্থা বহু আগেই অচল হয়ে গেছে। ছোটো ছোটো খাঁচার মতো একগাদা ফ্ল্যাট আর তাতে খুব বেশি হলে চার জন সদস্য, সেটাও নাকি পরিবার! আমাদের গ্রামের বাড়িতেও আগে জয়েন্ট ফ্যামিলি ছিলো, পরে অবশ্য সবাই সবার কর্মসূত্রে যে যার মতো আলাদা হয়ে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছি। নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্যও এখন ছুটির দরকার পরে।
তবে সৌম্যর বাড়িতে এসে অনেকদিন পরে আবার সেই পুরোনো স্বাদ ফিরে পেলাম। ঘরে ঢুকে সৌম্য সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো, আমিও ভদ্রতার খাতিরে বয়সজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে আলাপ করে নিলাম। সৌম্যর বাবারা তিন ভাই, সবাই ব্যবসা করে, সবাই বিবাহিত এবং প্রত্যেকের দুটি করে সন্তান। সৌম্যর দাদাও বিয়ে করেছে, তার আবার ছোট্ট একটা ফুটফুটে ৩-৪ বছরের মেয়ে, 'সোমা'। বাড়ির ছোটো সদস্য বলতে সে ই, তাই সবার আদরের, সারাদিন বাড়ি মাথায় করে রাখে। 
ব্যাগপত্র রেখে মোবাইলটা চার্জে বসিয়ে দিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়লাম। স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে, ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলাম। সৌম্যদের ডাইনিং টেবিলটাও বিশাল, বাড়ির সবাই মিলে একসাথে খাওয়া দাওয়া করা যায়। খাওয়ার সময় সবার মুখের দিকে একবার লক্ষ করলাম, সবাই কেমন যেন চুপশে রয়েছে, কেউ বেশি একটা কথাও বলছে না। সবার চলা বলা কেমন যেন যান্ত্রিক, প্রাণহীন, কেউ যেন তাদের কে রিমোট কন্ট্রোল করছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিশয়টা খেয়াল করলাম সবার সাজ-পোষাকে, যেন এখুনি সপরিবারে কোথাও বেড়াতে যাবে। আরও অবাক হলাম ওদের বাড়ির অবস্থা দেখে, সারা ঘরময় ধুলো ময়লা আর আপরিচ্ছন্নতার ছাপ, যেন বহুদিন এ বাড়িতে ঝাটা পর্যন্ত পড়েনি। এত বড়ো সুন্দর বাড়ি অথচ এত অবহেলা! বেশ অবাক হয়ে আমি সৌম্যর মা কে কথাটা বলেই ফেলি। ওর মা আমার দিকে তাকিয়ে বললো,- "কে করবে বাবা! এ বাড়িতে এসব করার জন্য কেউ আসেনা।" কথাটা শুনে চমকে উঠলাম আমি, কাকিমা বলে কী! এত গুলো লোক এই বাড়িতে থাকে, অথচ বলে কিনা কাজ করার জন্য কেউ নেই! তারপর ভাবলাম হয়তো চাকর-বাকরের কথা বলছে, হয়তো ছুটি নিয়েছে কিছু দিনের জন্য। তবুও এত অপরিচ্ছন্নতার মধ্যে এরা থাকে কি করে!
তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে আমি আর সৌম্য ঘরে চলে আসি। সৌম্য বিছানা রেডি করে শুতে ডাকে। শুয়ে শুয়ে দুজনে গল্প করতে লাগলাম, সৌম্য জানালো ওর ঝিলটা বাড়ি থেকে মোটামুটি দূরত্বে, বাইকে গেলে ১৫ মিনিট মতো সময় লাগবে। দুজনে ঠিক করলাম, সকালে খাওয়া দাওয়া সেরে সৌম্যর ঝিল দেখতে যাবো।
সকালে আমার ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হলো, উঠে দেখি সৌম্য পাশে নেই। ঘড়িতে তখন ১১ টা বাজে। চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখি পুরো ঘর চক চক করছে। সারা বাড়িতে কোথাও একটা ধুলোর কণা পর্যন্ত নেই। মনটা বেশ ভালো হয়ে গেল। হঠাৎ, কোত্থেকে যেন ছুটে এসে আমার সামনে একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সোমা, আমার দিকে মন গলানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আদুরে মিষ্টি গলায় ভাঙা ভাঙা ভাষায় বললো,- "তুমি সৌম্য কাকুর বন্ধু, তাইনা?" আমি সোমার সামনে হাটু গেড়ে বসে ওর ছোট্ট গালে আদর করে হাসতে হাসতে বললাম,- "হ্যা মামনি, কোথায় তোমার কাকু?" সাথে সাথে ছোট্ট সোমা এক দৌড়ে দরজার সামনে গিয়ে বাইরে উঠোনের দিকে ইশারা করে বললো,- "ওই যে কাকু।" আমি দরজার কাছে গিয়ে সোমার মাথায় হাত বুলিয়ে বাইরে উঠোনে গিয়ে দেখি সৌম্য ওর বাইকটা পরিস্কার করছে, আমাকে দেখতে পেয়ে বললো,- "কিরে! ঘুম ভাঙলো তোর?"
আমি বললাম,- "একটু বেলা হয়ে গেল রে, কিন্তু তোদের আজ হঠাৎ হলো কি? কতদিনের সব জমানো ময়লা আজ সব পরিস্কার ঝকঝকে হয়ে গেল যে!"
- "আমার মা, তুই কাল বলেছিলি বলে আজ সকাল থেকে কাজে লেগে পড়েছে, পুরো বাড়ি একেবারে ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলেছে।"
আমি একটু লজ্জিত হয়ে বললাম,- "ইস, কাকিমাকে কতটা কষ্ট দিলাম, কি মনে করবে বল তো!" 
পিছন থেকে সৌম্যর মায়ের গলা পেলাম,- "না না বাবা, মনে করার কিছু নেই, তুমি তো ভালো কথাই বলেছ। আসলে আমাদের বাড়িতে ওসব পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কারো লাগে না, তাই আর করাও হয় না, তুমি আসলে বলে বাড়িটাকে এখন একটু মানুষের বাড়ি বলে মনে হচ্ছে।" 
কাকিমার কথা শুনে আমি প্রতিবারই অবাক হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ওটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামালাম না। পাশ থেকে সৌম্য বললো,- "এখনা যা, ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে নে, তারপর বেরবো।"
আমিও কথামতো ব্রেকফাস্ট সেরে রেডি হয়ে গেলাম। বেরনোর সময় সোমা দৌঁড়ে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো। আমার দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখ করে বললো,- "কোথায় যাচ্ছ তুমি? আমাকে নিয়ে চলো না, আমিও যাবো।" মেয়েটার উপরে মনে হয় মায়া পড়ে যাবে, আমি আস্তে করে ওর গাল দুটো টিপে দিয়ে বললাম,- "আমি তো একটু পরেই চলে আসবো মামনি! তারপর বিকেলে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো, আচ্ছা?"
আমার কথা শুনে সোমার মুখটা শুকিয়ে গেল। অপরূপ মায়াবী চোখের কোণায় এক বিন্দু জলকণা চকচক করছে, সামান্য বাতাসের ছোঁয়াতেই তা ঝরে পড়বে মাটিতে। তার মুখের কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে মনে হলো যেন এটাই আমাদের শেষ দেখা, আর হয়তো কোনোদিন আমি ওকে দেখতে পারবো না। একটু ঢোক গিলে নিয়ে সোমা আবার বললো,- "আমি জানি, তুমি আর আসবে না, আমাকে নিয়ে চলো না তোমার সাথে, চল না আমাকে নিয়ে।"
হঠাৎ উঠোন থেকে সৌম্যর ডাক শুনতে পেলাম, বাইক স্টার্ট করে দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য। আমি আর কিছু না বলে সোমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। বাইকের ব্যাকসিটে বসে পিছনে তাকিয়ে হাত নেড়ে সোমাকে টাটা বলে রওনা হলাম ঝিলের উদ্দেশ্যে।
মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে গেলাম ঝিলে। রাস্তার পাশেই বড়ো ঝিল, চারপাশ পাচিল দিয়ে ঘেরা, সামনে দুই পাল্লার একটা তালা দেওয়া গেট। বাইকটা গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলাম দুজনে। গেট দিয়ে ঢুকেই সামনে একটা গুদাম ঘর, আর ডান দিকে বিশাল ঝিল। আমাকে দাঁড়াতে বলে সৌম্য গুদামঘরে ঢুকে গেল। আমি ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে পরিবেশটা দেখতে লাগলাম। 
মিনিট পাঁচেক হয়ে গেল, সৌম্য আসলো না। আরও পাঁচ মিনিট পরে আমার চিন্তা হতে লাগলো, আমি গুদাম ঘরের সামনে গিয়ে সৌম্যকে ডাকলাম, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেলনা। দূশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে আমি ঘরের দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে ফেললাম। খুলে যা দেখলাম, তাতে আমার শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে শিহরণের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। দেখলাম, ঘরের মেঝেতে উপুর হয়ে পড়ে আছে সৌম্য, অসাড়, প্রানহীণ, মুখ থেকে ফেনা উঠছে। "এটা কি করল সৌম্য !" ভয়ে দুঃখে আমার মাথা ঘুরতে লাগলো, কোনো মতে ছুটে বেরিয়ে এলাম রাস্তায় সাহায্য পাওয়ার আশায়। দেখলাম, রাস্তার পাশে একটা এসি বাস দাঁড়িয়ে আছে। দৌঁড়ে বাসের কাছে গিয়ে দেখি, বাসের ড্রাইভিং সিটে কেউ নেই, তবে বাসের দরজাটা খোলা। আমি সোজা বাসের মধ্যে ঢুকে গেলাম। বাসের মধ্যে ঢুকে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সেই দৃশ্য আজও আমার চোখের সামনে ভাসে। বাসের মধ্যে সৌম্যর বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য বাসের সিটে বসে আছে। সবার চোখ বন্ধ, কোনো নড়াচড়া নেই, যেন সবাই ঘুমোচ্ছে, কিন্তু এই ঘুম যে আর কোনও দিনও ভাঙবে না তা বেশ বুঝতে পারলাম।
"এ এ, এসব কি হচ্ছে আমার সাথে! আমি কি পাগোল হয়ে গেলাম‌! এ এ নিশ্চই আমার চোখের ভুল। না না, এটা কিছুতেই হতে পারে না।" ভয়ে ভাবনায় আমার মনে হলো অজ্ঞান হয়ে যাবো। কিন্তু তখনও আরো অনেক কিছু দেখার বাকি। হঠাৎ, কানে ভেসে এলো সোমার গলা, যেন দূর থেকে সে আমায় ডাকছে। ছুটে বাস থেকে বেরিয়ে এলাম, সোমার আওয়াজ ধাওয়া করে ঝিলের দিকে দৌঁড়োলাম। সোমা দাঁড়িয়ে আছে ঝিলের দক্ষিণ পাড়ে। আমি দূর থেকে ডাকলাম, "এইযে মামনি ! আমি এখানে। তুমি দাঁড়াও, আমি আসছি।" উর্ধশ্বাসে ছুটতে লাগলাম সোমার দিকে। কিছুটা কাছে যেতেই হঠাৎ, সোমার ছোট্ট দেহটা ঢলে পড়লো ঝিলের জলে। তারপরেই একটা গাছের শিকড়ে হোচোট খেয়ে সজোরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি আমি। 
যখন চোখ খুললো, নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিস্কার করলাম। আমি উঠে বসতেই বেডের পাশে বসে থাকা একজন ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "এখন কেমন আছেন?" আমি হাসপাতালের ঘরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললাম, "আমাকে এখানে কে আনলো?" 
ভদ্রলোক জবাব দিলেন, "আপনাকে আমি হাসপাতালের পিছনে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছি, আমি এই হাসপাতালের ডাক্তার।"
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, রাত ৮টা বাজে। আমি তাকে বললাম, "সৌম্য কোথায়? তাড়াতাড়ি আমার সাথে চলুন ডাক্তারবাবু, অনেক বড়ো বিপদ হয়ে গেছে।"
আমার কথায় ডাক্তার হকচকিয়ে উঠলেন, বললেন "কি বিপদ হয়েছে? আর আপনি কোন সৌম্যর কথা বলছেন?"
আমি যতটা সম্ভব ডাক্তারবাবুকে পুরো ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। আমার কথা শুনে ডাক্তার যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, - "আপনি কি মাছ ব্যবসায়ী সৌম্য রায়-এর কথা বলছেন?"
- "হ্যাঁ ডাক্তারবাবু ! আপনি ওকে চেনেন নাকি? বলুন না !!"
আমার কথা শুনে ডাক্তারবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, 
-"আপনার কথা তো মশাই আমার কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আরে, সৌম্য রায় তো গত দুসপ্তাহ আগে‌ মারা গেছেন। আমার হাসপাতালেই ভর্তি করা হয়েছিলো। হ্যাঁ মনে পড়েছে, বিষ খেয়ে আত্মহত্যার কেস্ ছিল। অনেক দেরি হয়ে গেছিল বলে আর বাঁচাতে পারিনি। ওর যে কর্মচারী ওকে এখানে এনেছিল, তার কাছে পুরোটা শুনেছিলাম। কিছুদিন আগে সৌম্যর পরিবার পুরিতে ঘুরতে গেছিলো, সৌম্যর দরকারি কাজ পড়ে যাওয়ায় সে যেতে পারেনি। যেদিন সৌম্যর পরিবার বাসে করে বাড়ি ফিরছিলো, সেদিন ওই ঝিলের সামনে বাসে ডাকাতি হয়, সমস্ত বাসযাত্রীদের বন্দুকের বুলেটে ঝাঝরা করে দেয় ডাকাতের দল, কিন্তু কোনো কারণে সৌম্যদের বাড়ির একটা বাচ্চা মেয়ে ওই দূর্ঘটনায় বেঁচে যায়। পুলিশ স্পটে গিয়ে মেয়েটাকে উদ্ধার করে, পরে সেই পুলিশকে পুরো ঘটনাটা জানায়। কিন্তু কিছুদিন পরে মেয়েটা হঠাৎ ঝিলে পরে গিয়ে ডুবে মারা যায়। তার পরের দিনই সৌম্য হয়তো প্রচন্ড শোকের বসেই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। পরে ঝিলের ওই কর্মচারী সৌম্যর ডেড বডি হাসপাতালে নিয়ে আসে। পরে অবশ্য শুনেছি, ওই কর্মচারী নাকি এক রাতে ঝিলের পাড়ে ওই বাচ্চা মেয়েটাকে দেখে ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল। তার পর থেকেই এই বিষয়টা নিয়ে গ্রামে ভিষন চর্চা শুরু হয়েছে।"
ডাক্তারের কথা শুনে আমার চিন্তা ভাবনা সব যেন গুলিয়ে যেতে লগলো, কোনো কিছু বোঝার মতো পর্যায়ে আমি আর ছিলাম না। আমার চোখের সামনে সৌম্যর পরিবারের সবার মুখগুলো পরপর ভাসতে লাগলো। ধীরে ধীরে ওই মুখগুলো চক্রাকারে আমার মাথার চারাপাশে ঘুরতে শুরু করলো আর কানে একটা আদুরে মিষ্টি গলা ভেসে আসতে লাগলো, "বলেছিলাম আমাকে নিয়ে যাও, আমি তো জানতাম তুমি আর আসবে না।"
আমার চোখদুটো ধীরেধীরে আবার অন্ধকারে ঢেকে গেল। 

লেখক : অন্তু সরকার


(আরও অনেক ভৌতিক গল্পের আপডেট পেতে "প্রেতলোক"-এর ফেসবুক পেজে লাইক করুন, ধন্য়বাদ)

ফেসবুক পেজের লিংক : প্রেতলোক - Bengali Horror


মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন